স্ট্রোক বা ব্রেইন স্ট্রোক একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, যা হঠাৎ করেই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে গেলে স্ট্রোক হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, পক্ষাঘাত, কথা বলার সমস্যা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানো এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব।
স্ট্রোকের লক্ষণ কী, কেন স্ট্রোক হয়, কাদের ঝুঁকি বেশি এবং স্ট্রোক হলে কী করতে হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন।
ব্রেইন স্ট্রোক কী?
ব্রেইন স্ট্রোক (Brain Stroke) হলো এমন একটি জরুরি চিকিৎসাগত অবস্থা, যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটে।
স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের:
- ১. ইস্কেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke): মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে বা অন্য কোনো বাধার কারণে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এই ধরনের স্ট্রোক হয়।
- ২. হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke): মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে এই ধরনের স্ট্রোক হয়।
দুই ধরনের স্ট্রোকের চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা। তাই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে সঠিক রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি।
স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ কী কী?
স্ট্রোকের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। বিশেষ করে শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া অথবা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া ব্রেইন স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
১. হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া
স্ট্রোকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো মুখের এক পাশ ঝুলে পড়া বা বেঁকে যাওয়া।
রোগীকে হাসতে বললে মুখের দুই পাশ সমানভাবে নড়াচড়া না-ও করতে পারে। মুখের এক পাশ অবশও লাগতে পারে।
২. হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া
হঠাৎ শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা অবশ অনুভূত হওয়া স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।
রোগীকে দুই হাত একসঙ্গে ওপরে তুলতে বললে একটি হাত নিচে নেমে যেতে পারে।
৩. কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে সমস্যা হওয়া
হঠাৎ কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া, সহজ বাক্য বলতে না পারা অথবা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
কখনো রোগী কথা বলতে চাইলেও সঠিক শব্দ খুঁজে পান না।
৪. হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা
স্ট্রোকের কারণে এক বা দুই চোখে হঠাৎ ঝাপসা দেখা, দুটি করে দেখা কিংবা দৃষ্টিশক্তি আংশিক বা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
৫. মাথা ঘোরা ও ভারসাম্য হারানো
হঠাৎ হাঁটতে সমস্যা হওয়া, শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা অথবা হাত-পায়ের সমন্বয় ঠিক রাখতে না পারা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।
৬. হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে তা বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের সতর্ক সংকেত হতে পারে।
মাথাব্যথার সঙ্গে বমি, চেতনার পরিবর্তন বা অন্য স্নায়বিক সমস্যা থাকলে জরুরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
মনে রাখবেন: এসব লক্ষণের যেকোনো একটি হঠাৎ দেখা দিলেই স্ট্রোক সন্দেহ করতে হবে। সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেওয়া জরুরি নয়।
স্ট্রোক চেনার সহজ উপায়: B.E.F.A.S.T.
স্ট্রোকের সতর্ক সংকেত দ্রুত শনাক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে B.E.F.A.S.T. পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
- B – Balance: হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা বা হাঁটতে অসুবিধা হওয়া।
- E – Eyes: হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন বা চোখে ঝাপসা দেখা।
- F – Face: মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া বা ঝুলে পড়া।
- A – Arms: এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া বা তুলতে না পারা।
- S – Speech: কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে সমস্যা হওয়া।
- T – Time: সময় নষ্ট না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া।
এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব স্ট্রোক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে এমন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে।
বাংলাদেশে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সহায়তার জন্য ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
স্ট্রোক হওয়ার প্রধান কারণ ও ঝুঁকির বিষয়গুলো
স্ট্রোকের ঝুঁকি বিভিন্ন কারণে বাড়তে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- উচ্চ রক্তচাপ।
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস।
- রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল।
- ধূমপান।
- অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
- হৃদ্রোগ বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন (Atrial Fibrillation)।
- পূর্বে স্ট্রোক বা ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA) হওয়ার ইতিহাস।
- বয়স বৃদ্ধি এবং পারিবারিক ইতিহাস।
বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কারণ।
স্ট্রোক হলে তাৎক্ষণিক কী করবেন?
স্ট্রোক সন্দেহ হলে ঘরোয়া চিকিৎসা বা অপেক্ষা করার পরিবর্তে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে।
যা করবেন:
- দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করুন এবং উপযুক্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়ার উদ্যোগ নিন।
- রোগীর লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে অথবা সর্বশেষ কখন তাঁকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দেখা গেছে, সেই সময়টি মনে রাখুন।
- রোগীকে নিরাপদ ও আরামদায়ক অবস্থায় রাখুন। অপ্রয়োজনীয় হাঁটাচলা করাবেন না।
- রোগীর নিয়মিত ওষুধ, পূর্বের চিকিৎসার তথ্য এবং রোগের ইতিহাস চিকিৎসককে জানান।
যা করবেন না:
- লক্ষণ নিজে নিজে সেরে যাবে ভেবে অপেক্ষা করবেন না।
- চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার নতুন ওষুধ দেবেন না।
- গিলতে সমস্যা থাকতে পারে বলে খাবার, পানি বা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেবেন না।
- রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না।
স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত না হয়ে ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
নির্বাচিত ইস্কেমিক স্ট্রোকের রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরুর ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে শিরাপথে রক্তের জমাট ভাঙার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। আবার কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তের জমাট অপসারণের সুযোগ থাকতে পারে।
তবে এসব চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয়। রোগীর অবস্থা, মস্তিষ্কের স্ক্যান এবং অন্যান্য পরীক্ষার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
চিকিৎসার সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে মনে হলেও হাসপাতালে যেতে দেরি করা যাবে না।
স্ট্রোকের লক্ষণ কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে গেলে কি চিন্তার কারণ আছে?
অবশ্যই।
অনেক সময় স্ট্রোকের মতো লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে যেতে পারে। এটি ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (Transient Ischemic Attack বা TIA) হতে পারে।
TIA-কে অনেক সময় মিনি স্ট্রোক বলা হয়। এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হতে পারে।
তাই লক্ষণ সাময়িকভাবে চলে গেলেও জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
স্ট্রোক প্রতিরোধে কী করবেন?
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
- নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন ও নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করুন।
- ধূমপান পরিহার করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- সুষম খাবার খান এবং খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমান।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
- হৃদ্রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা নিন।
- চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন।
স্ট্রোক সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
স্ট্রোকের প্রথম লক্ষণ কী?
স্ট্রোকের প্রথম লক্ষণ হিসেবে হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন অথবা ভারসাম্য হারানোর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কম বয়সেও কি স্ট্রোক হতে পারে?
হ্যাঁ। স্ট্রোক শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। কম বয়সী ব্যক্তিদেরও স্ট্রোক হতে পারে। কিছু হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে কম বয়সেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্ট্রোক হলে কি রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন?
অনেক রোগী চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তবে সুস্থতার মাত্রা স্ট্রোকের ধরন, তীব্রতা, মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমাণ এবং চিকিৎসা পাওয়ার সময়ের ওপর নির্ভর করে।
স্ট্রোক হলে কোন ডাক্তার দেখাতে হবে?
স্ট্রোক সন্দেহ হলে প্রথমে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিউরোলজিস্ট, স্ট্রোক বিশেষজ্ঞ, নিউরোসার্জন এবং অন্যান্য চিকিৎসকের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
স্ট্রোকের আগে কি মাথাব্যথা হয়?
সব স্ট্রোকের আগে মাথাব্যথা হয় না। তবে হঠাৎ অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা, বিশেষ করে অন্য স্নায়বিক লক্ষণের সঙ্গে দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসাগত অবস্থা। সঠিক সময়ে স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো রোগীর জীবন বাঁচাতে ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দিলে সময় নষ্ট করবেন না।
মনে রাখবেন: স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময়ই মস্তিষ্ক।
মস্তিষ্ক ও স্ট্রোক-পরবর্তী চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
ডা. আতিকুর রহমান রিমেল
MBBS, BCS (Health), MS (Neurosurgery)
Consultant Neurosurgeon
National Institute of Neurosciences & Hospital, Dhaka
মস্তিষ্ক, স্ট্রোক ও নিউরো-স্পাইন সংক্রান্ত সমস্যার মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফলোআপের বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারেন।
চেম্বারসমূহ:
ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা
সিরিয়াল: 09610-009612
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, মিরপুর-১১, ঢাকা
সিরিয়াল: 01810000118
বিস্তারিত চেম্বার ও সময়সূচি: https://drrimelneuro.com/chamber/
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে নিয়মিত চেম্বারের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা না করে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করুন।