মাথায় আঘাত পাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা হলেও এর পরিণতি কখনো কখনো গুরুতর হতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, খেলাধুলার সময় আঘাত কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত লাগতে পারে।
অনেক সময় মাথায় আঘাত পাওয়ার পর বাইরে কোনো বড় ক্ষত দেখা যায় না। কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতরে আঘাত, রক্তক্ষরণ কিংবা অন্য কোনো জটিলতা থাকতে পারে।
বিশেষ করে মাথায় আঘাতের পর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বারবার বমি, তীব্র মাথাব্যথা, খিঁচুনি অথবা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
তাই মাথায় আঘাত পাওয়ার পর কী করবেন, কোন লক্ষণগুলো বিপজ্জনক এবং কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাথায় আঘাত বা Head Injury কী?
মাথায় আঘাত (Head Injury) বলতে মাথার ত্বক, খুলির হাড় অথবা মস্তিষ্কে আঘাত লাগাকে বোঝায়।
আঘাতের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে।
১. কনকাশন (Concussion)
কনকাশন হলো এক ধরনের ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি, যার ফলে সাময়িকভাবে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এতে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, মনোযোগের সমস্যা, স্মৃতিভ্রংশ অথবা বিভ্রান্তি হতে পারে। অজ্ঞান না হলেও কনকাশন হতে পারে।
২. স্কাল ফ্র্যাকচার (Skull Fracture)
মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের কারণে খুলির হাড়ে ফাটল বা ভাঙন সৃষ্টি হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে খুলির হাড়ের আঘাতের সঙ্গে মস্তিষ্কের ক্ষতিও থাকতে পারে।
৩. মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (Intracranial Hemorrhage)
মাথায় আঘাতের ফলে মস্তিষ্কের ভেতরে অথবা মস্তিষ্কের চারপাশে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
এতে মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়ে জীবনঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
৪. ব্রেইন কনটিউশন (Brain Contusion)
মস্তিষ্কের টিস্যুতে সরাসরি আঘাতের কারণে ক্ষত বা রক্তক্ষরণ হলে তাকে ব্রেইন কনটিউশন বলা হয়।
এসব অবস্থার সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে জরুরি বিভাগে পরীক্ষা করানো জরুরি।
মাথায় আঘাত পাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে কী করবেন?
মাথায় আঘাত লাগলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
১. রোগী সচেতন আছেন কি না পরীক্ষা করুন
আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সহজ প্রশ্ন করুন। যেমন:
- আপনার নাম কী?
- আপনি কোথায় আছেন?
- কীভাবে আঘাত পেয়েছেন?
রোগী স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিতে পারছেন কি না, তা লক্ষ্য করুন।
কেউ অচেতন হলে, জাগানো না গেলে অথবা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে জরুরি সাহায্য ডাকুন। প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষণ অনুযায়ী CPR শুরু করুন।
২. মাথা ও ঘাড় অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া করাবেন না
সড়ক দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া অথবা গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে ঘাড়ের মেরুদণ্ডেও আঘাত থাকতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে অযথা টানাটানি করবেন না।
তাঁকে সম্ভব হলে যে অবস্থায় পাওয়া গেছে সে অবস্থায় রাখুন, যদি না শ্বাস-প্রশ্বাস নিশ্চিত করা, CPR দেওয়া বা তাৎক্ষণিক বিপদ থেকে সরানোর প্রয়োজন হয়।
৩. মাথায় রক্তপাত হলে সতর্কভাবে ব্যবস্থা নিন
মাথার ত্বকে সাধারণ কাটা ক্ষত থেকে রক্তপাত হলে পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে চাপ দিয়ে রক্তপাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যায়।
তবে খুলির হাড় ভেঙে যাওয়ার সন্দেহ থাকলে ক্ষতস্থানে সরাসরি চাপ দেবেন না। ক্ষতের ভেতরে ঢুকে থাকা কোনো বস্তু নিজে সরানোর চেষ্টা করবেন না।
৪. আঘাতের সময় ও লক্ষণ লক্ষ্য করুন
কখন আঘাত পেয়েছেন, অজ্ঞান হয়েছিলেন কি না, বমি হয়েছে কি না এবং আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না—এসব তথ্য মনে রাখুন।
চিকিৎসককে এই তথ্যগুলো জানালে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করতে সুবিধা হয়।
৫. বিপজ্জনক লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যান
মাথায় আঘাতের পর রোগীর অবস্থা গুরুতর মনে হলে অথবা বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে।
বাংলাদেশে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সহায়তার জন্য ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
মাথায় আঘাতের পর বিপজ্জনক লক্ষণ কী কী?
মাথায় আঘাতের পর কিছু লক্ষণ মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতির সতর্ক সংকেত হতে পারে।
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন:
১. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা জাগানো না যাওয়া
মাথায় আঘাতের পর রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে বা জাগানো না গেলে তা গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
অল্প সময়ের জন্য অজ্ঞান হয়ে পরে স্বাভাবিক হলেও জরুরি বিভাগে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
২. বারবার বমি হওয়া
মাথায় আঘাতের পর বারবার বমি হতে থাকলে মস্তিষ্কে আঘাত বা অন্য জটিলতার সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা জরুরি।
আঘাতের পর একবার বমি হলেও চিকিৎসকের মাধ্যমে দ্রুত মূল্যায়ন করানো উচিত।
৩. তীব্র বা ক্রমশ বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
আঘাতের পর মাথাব্যথা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে মাথাব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকলে অথবা অসহ্য হয়ে উঠলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
৪. খিঁচুনি হওয়া
মাথায় আঘাতের পর খিঁচুনি হলে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
খিঁচুনির সময় রোগীর মুখে কিছু দেবেন না এবং জোর করে হাত-পা চেপে ধরবেন না।
৫. কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীর দুর্বল হওয়া
আঘাতের পর হঠাৎ কথা বলতে সমস্যা, হাঁটতে অসুবিধা অথবা শরীরের কোনো অংশ অবশ বা দুর্বল হয়ে গেলে মস্তিষ্ক বা স্নায়ুর গুরুতর সমস্যার আশঙ্কা থাকতে পারে।
৬. অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি
রোগী অতিরিক্ত ঘুমিয়ে পড়ছেন, পরিচিত মানুষকে চিনতে পারছেন না অথবা আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে—এ ধরনের লক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
৭. কান বা নাক দিয়ে রক্ত বা স্বচ্ছ তরল বের হওয়া
মাথায় আঘাতের পর কান বা নাক দিয়ে রক্ত অথবা অস্বাভাবিক স্বচ্ছ তরল বের হলে খুলির হাড়ের গুরুতর আঘাতের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
৮. চোখের মণি অসমান বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
এক চোখের মণি অন্যটির তুলনায় বড় হয়ে যাওয়া, দুটি করে দেখা অথবা দৃষ্টিশক্তির নতুন সমস্যা তৈরি হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ: এসব লক্ষণ আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে অথবা কিছু সময় পর দেখা দিতে পারে। তাই শুরুতে ভালো মনে হলেও পরবর্তী অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ্য করা জরুরি।
মাথায় আঘাতের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় করণীয়
চিকিৎসক মূল্যায়ন করে আঘাত সামান্য বলে নিশ্চিত করলে এবং বাড়িতে থাকার অনুমতি দিলে প্রথম ২৪ ঘণ্টা কিছু সতর্কতা অনুসরণ করা উচিত।
১. একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পর্যবেক্ষণে থাকুন। রোগীর আচরণ, সচেতনতা এবং নতুন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না তা লক্ষ্য করুন।
২. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। প্রথম এক-দুই দিন শারীরিক ও মানসিক চাপ কমিয়ে রাখুন।
৩. প্রয়োজনে ঠান্ডা সেঁক দিন। বাহ্যিক ফোলা থাকলে কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা সেঁক অল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিন। সাধারণ মাথাব্যথার ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল উপযুক্ত হতে পারে। তবে নিজে থেকে অ্যাসপিরিন বা নতুন রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করবেন না। আগে থেকে নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করার সিদ্ধান্তও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নেবেন না।
৫. ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজে ফিরুন। উপসর্গ না বাড়লে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী হালকা দৈনন্দিন কাজ শুরু করা যায়।
মাথায় আঘাতের পর যা করবেন না
- চিকিৎসকের মূল্যায়ন ছাড়া গুরুতর আঘাতকে সাধারণ আঘাত মনে করে বাড়িতে অপেক্ষা করবেন না।
- অ্যালকোহল বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ বা ঘুমঘুম ভাব সৃষ্টি করে এমন ওষুধ খাবেন না।
- পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগে গাড়ি চালাবেন না।
- মাথায় পুনরায় আঘাত লাগতে পারে এমন খেলাধুলায় অংশ নেবেন না।
- গুরুতর আঘাতের পর রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না।
মাথায় আঘাতের পর কি ঘুমানো যাবে?
অনেকে মনে করেন মাথায় আঘাত লাগলে রোগীকে ঘুমাতে দেওয়া যাবে না। এটি সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
চিকিৎসক মূল্যায়ন করে বাড়িতে থাকার অনুমতি দিলে এবং বিপজ্জনক লক্ষণ না থাকলে রোগী স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারেন।
তবে প্রথম ২৪ ঘণ্টা একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পর্যবেক্ষণে থাকা উচিত।
রোগীকে জাগানো কঠিন হলে, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে অথবা সচেতনতার পরিবর্তন হলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
মাথায় আঘাতের পর কখন CT Scan করা প্রয়োজন?
CT Scan হলো মাথায় গুরুতর আঘাতের পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, খুলির হাড়ের ফ্র্যাকচার অথবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ আঘাত শনাক্ত করার একটি প্রধান পরীক্ষা।
তবে মাথায় আঘাত লাগলেই সবার CT Scan করার প্রয়োজন হয় না।
চিকিৎসক কিছু বিষয় বিবেচনা করে CT Scan করার সিদ্ধান্ত নেন। যেমন:
- আঘাতের পর রোগীর সচেতনতার অবস্থা।
- খিঁচুনি বা স্নায়বিক দুর্বলতা।
- বারবার বমি হওয়া।
- খুলির হাড় ভাঙার সন্দেহ।
- আঘাতের তীব্রতা ও ধরন।
- অজ্ঞান হওয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ইতিহাস।
- রোগীর বয়স এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি।
- রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবনের ইতিহাস।
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি অথবা রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে সামান্য মনে হওয়া আঘাতও দ্রুত মূল্যায়ন করা জরুরি।
মনে রাখবেন: CT Scan স্বাভাবিক এলেও কনকাশন থাকতে পারে। তাই পরীক্ষা স্বাভাবিক হলেই সব উপসর্গ উপেক্ষা করা যাবে না।
শিশুদের মাথায় আঘাত লাগলে কী করবেন?
শিশুদের মাথায় আঘাত লাগলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। অনেক ছোট শিশু তাদের সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না।
শিশুর মাথায় আঘাত লাগার পর নিচের লক্ষণগুলো লক্ষ্য করুন:
- অস্বাভাবিক কান্নাকাটি বা সহজে শান্ত না হওয়া।
- দুধ বা খাবার খেতে না চাওয়া।
- বারবার বমি।
- অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব।
- আচরণে পরিবর্তন।
- খিঁচুনি।
- হাঁটাচলা বা ভারসাম্যের সমস্যা।
এসবের মধ্যে বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি বিভাগে নিতে হবে।
শিশুর বয়স, আঘাতের ধরন এবং অন্যান্য উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
মাথায় আঘাতের পর কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়?
মাথায় আঘাতের চিকিৎসা নির্ভর করে আঘাতের ধরন, মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমাণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর।
১. পর্যবেক্ষণ ও ওষুধ
সামান্য আঘাত বা কনকাশনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়নের পর পর্যবেক্ষণ, উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজে ফেরার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
২. হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণ
মাঝারি বা গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাতের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করে সচেতনতা, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তচাপ এবং স্নায়বিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে।
৩. নিউরোসার্জারি
মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ অথবা নির্দিষ্ট ধরনের খুলির হাড়ের আঘাতের ক্ষেত্রে জরুরি নিউরোসার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
তবে সব মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হয় না।
৪. পুনর্বাসন চিকিৎসা
গুরুতর ব্রেইন ইনজুরির পর কিছু রোগীর ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং অন্যান্য পুনর্বাসন সেবার প্রয়োজন হতে পারে।
মাথায় আঘাতের পর দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হতে পারে কি?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আঘাতের পর কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, মনোযোগের সমস্যা অথবা ক্লান্তি থাকতে পারে।
কনকাশনের পর কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা।
- মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা।
- মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যের সমস্যা।
- ঘুমের সমস্যা।
- মেজাজ বা আচরণের পরিবর্তন।
- দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা।
উপসর্গ দুই থেকে তিন সপ্তাহেও ভালো না হলে অথবা স্বাভাবিক কাজে ফেরার পর বেড়ে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
মাথায় আঘাত প্রতিরোধে করণীয়
সচেতনতা এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে মাথায় আঘাতের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
১. মোটরসাইকেল চালানোর সময় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করুন।
২. গাড়িতে চলাচলের সময় সিটবেল্ট পরুন।
৩. শিশুদের খেলাধুলার স্থান নিরাপদ রাখুন।
৪. সিঁড়ি ও বাথরুমে পিছলে পড়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিন।
৫. উঁচু স্থানে কাজ করার সময় যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করুন।
৬. খেলাধুলার সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
মাথায় আঘাত সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
মাথায় আঘাত পাওয়ার পর প্রথমে কী করা উচিত?
প্রথমে রোগীর সচেতনতা ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করুন। গুরুতর আঘাত বা বিপজ্জনক লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। ঘাড়ে আঘাতের সন্দেহ থাকলে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া করাবেন না।
মাথায় আঘাত লাগার কতক্ষণ পর লক্ষণ দেখা দেয়?
কিছু লক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয়। আবার কনকাশন বা অন্যান্য জটিলতার কিছু উপসর্গ কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পরও প্রকাশ পেতে পারে।
মাথায় আঘাত পাওয়ার পর বমি হলে কি বিপদ?
মাথায় আঘাতের পর বমি হলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। বারবার বমি হওয়া গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাতের সতর্ক সংকেত হতে পারে।
মাথায় আঘাত লাগলে কি CT Scan করতে হয়?
সবার CT Scan প্রয়োজন হয় না। রোগীর উপসর্গ, আঘাতের ধরন এবং অন্যান্য ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
মাথায় আঘাত পাওয়ার পর কি ঘুমানো যাবে?
চিকিৎসক মূল্যায়ন করে বাড়িতে থাকার অনুমতি দিলে ঘুমানো যায়। তবে প্রথম ২৪ ঘণ্টা একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পর্যবেক্ষণে থাকা উচিত।
মাথায় আঘাতের পর অজ্ঞান না হলে কি বিপদ নেই?
অজ্ঞান না হলেও কনকাশন বা অন্যান্য মস্তিষ্কের আঘাত থাকতে পারে। তাই অন্যান্য লক্ষণ ও ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।
মাথায় আঘাতের জন্য কোন ডাক্তার দেখাবেন?
গুরুতর বা সন্দেহজনক মাথায় আঘাতের ক্ষেত্রে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিউরোসার্জন, নিউরোলজিস্ট এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসায় যুক্ত হন।
মাথায় আঘাতের পর কত দিনে সুস্থ হওয়া যায়?
সুস্থ হতে কতদিন লাগবে তা আঘাতের ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। সামান্য কনকাশনের অনেক রোগী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি করেন। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন লাগতে পারে।
উপসংহার
মাথায় আঘাত পাওয়ার ঘটনাকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য আঘাতের পর রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছু পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতি বা রক্তক্ষরণ হতে পারে।
তাই মাথায় আঘাত পাওয়ার পর কী করবেন তা জানা, বিপজ্জনক লক্ষণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বারবার বমি, খিঁচুনি, ক্রমশ বাড়তে থাকা মাথাব্যথা অথবা স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দিলে দেরি করবেন না।
মনে রাখবেন: মাথায় আঘাতের পর সঠিক সময়ে চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে এবং স্থায়ী জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মাথায় আঘাত ও মস্তিষ্কের সমস্যায় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
ডা. আতিকুর রহমান রিমেল
MBBS, BCS (Health), MS (Neurosurgery)
Advanced Neuro-vascular & Stroke Fellowship — Japan
Endoscopic Skull Base Surgery Fellowship — Japan
Neuroendoscopy Fellowship — India
কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন
National Institute of Neurosciences & Hospital, Dhaka
মাথায় আঘাত, ব্রেইন ইনজুরি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং নিউরোসার্জারি সংক্রান্ত সমস্যার মূল্যায়ন ও ফলোআপ চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিতে পারেন।
চেম্বার ১: ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তরা
ঠিকানা: হাউস #১৪, রোড #১১, সেক্টর #৬, উত্তরা, ঢাকা।
সিরিয়াল: 09610-009612
চেম্বার ২: ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, মিরপুর-১১
ঠিকানা: প্লট #১, ব্লক #সি, মিরপুর-১১, ঢাকা।
সিরিয়াল: 01810000118
ওয়েবসাইট: https://drrimelneuro.com/
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি স্বাস্থ্য সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রস্তুত। এটি সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। গুরুতর মাথায় আঘাত বা বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে চেম্বারের সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা না করে অবিলম্বে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।